১. আল–কুরআনের আলোকে আরাফাহর দিনের শ্রেষ্ঠত্ব ও দ্বীনের পূর্ণাঙ্গতা
৯ই জিলহজ বা আরাফাহর দিন শুধু হজের জন্য নয়, বরং পুরো মানবজাতির জন্য এক ঐতিহাসিক ও মহিমান্বিত দিন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা এই দিনটির গুরুত্ব বোঝাতে এর শপথ করেছেন। সূরা আল-বুরুজের ৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, “শপথ প্রত্যক্ষকারীর (শাহিদ) এবং যা প্রত্যক্ষ করা হয় (মাশহুদ)।” বিখ্যাত সাহাবি হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘শাহিদ’ হলো জুমার দিন আর ‘মাশহুদ’ হলো আরাফাহর দিন। (সুনান আত-তিরমিজি)।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই মহিমান্বিত দিনেই দ্বীন ইসলাম পূর্ণাঙ্গতা লাভ করেছিল। বিদায় হজের দিন আরাফাহর ময়দানে রাসূল (সা.) যখন উটের পিঠে চড়ে উকুফ (অবস্থান) করছিলেন, ঠিক তখন কুরআনের এই ঐতিহাসিক আয়াতটি নাজিল হয়:
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا
অর্থ: “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।” (সূরা আল–মায়িদাহ, আয়াত: ৩)।
একজন ইহুদি যখন হযরত উমর (রা.)-কে বলেছিল, “আপনাদের কুরআনে এমন একটি আয়াত আছে, যা যদি আমাদের প্রতি নাজিল হতো, তবে আমরা সেই দিনটিকে ঈদের দিন বানাতাম।” হযরত উমর (রা.) তখন উত্তর দিয়েছিলেন, “আমি অবশ্যই জানি এই আয়াত কোন দিনে ও কোন স্থানে নাজিল হয়েছিল; সেদিন আমাদের জন্য দুটি ঈদের দিন ছিল—সেটি ছিল জুমার দিন এবং আরাফাহর দিন।” (সহীহ বুখারী)।
২. হাদিসের আলোকে হজের মূল ভিত্তি ও গুনাহ মাফের শ্রেষ্ঠ সুযোগ
হাদিস শরিফে আরাফাহর দিনকে হজের সবচেয়ে বড় রুকন বা প্রধান স্তম্ভ বলা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:
الحَجُّ عَرَفَةُ
অর্থ: “আরাফাহর ময়দানে অবস্থান করাই হলো মূল হজ।” (সুনান আন–নাসায়ী)।
এই দিনে আল্লাহ তাআলা পরম করুণাময় হিসেবে বান্দাদের ক্ষমা করেন। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “আরাফাহর দিনের চেয়ে অন্য কোনো দিন আল্লাহ তাআলা এত বেশিসংখ্যক বান্দাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন না। আল্লাহ এই দিনে বান্দাদের খুব কাছাকাছি হন এবং ফেরেশতাদের সামনে গর্ব করে বলেন—দেখো, আমার এই বান্দারা এলোমেলো চুলে দূর-দূরান্ত থেকে এসে আমার কাছে কী চায়?” (সহীহ মুসলিম)।

৩. ৯ই জিলহজ ফজর থেকে সূর্যোদয়: মিনা থেকে যাত্রার সূচনা
৯ই জিলহজ ফজরের নামাজ হাজিগণ মিনার তাঁবুতে জামাতের সাথে আদায় করেন। নামাজ শেষ করে তাকবিরে তাশরিক ও তালবিয়া পাঠ করতে করতে হাজিরা সূর্যোদয় পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। সূর্য সম্পূর্ণভাবে উদিত হওয়ার পর হাজিগণ মিনা থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত আরাফাহর ময়দানের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। সহীহ বুখারীর বর্ণনা মতে, হাজিদের কেউ তালবিয়া (লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক…) পড়ছিলেন আবার কেউ তাকবির (আল্লাহু আকবার) ধ্বনি দিচ্ছিলেন, আর রাসূল (সা.) কাউকে নিষেধ করেননি। এই যাত্রাই হলো হাজিদের পরম ইবাদতের মূল সূচনা।
৪. খুতবা শ্রবণ ও যোহর–আসর একত্রে কসর করা (জমউত তাকদীম)
হাজিগণ দুপুরের মধ্যে আরাফাহর সীমানার ভেতরে প্রবেশ করে নিজ নিজ তাঁবুতে অবস্থান নেন। জিলহজের ৯ তারিখ দ্বিপ্রহরের পর (সূর্য ঢলে পড়ার পর) আরাফাহর ‘মসজিদে নামিরাহ’ থেকে হজের মূল ঐতিহাসিক খুতবা দেওয়া হয়। খুতবা শেষ হওয়ার পর পরই নামাজের আজান দেওয়া হয়। শরীয়তের বিশেষ বিধান অনুসারে এখানে যোহর ও আসরের নামাজকে একত্র করে যোহরের ওয়াক্তেই পরপর আদায় করতে হয়, যাকে ‘জমউত তাকদীম’ বলে। এক আজান ও দুই ইকামতের মাধ্যমে প্রথমাংশে যোহরের ২ রাকাত (কসর) ফরজ এবং পরে আসরের ২ রাকাত (কসর) ফরজ পরপর পড়া হয়, মাঝখানে কোনো সুন্নাত বা নফল নামাজ পড়া হয় না।
৫. উকুফে আরাফাহ: দোয়া ও রোনাজারির চরম মুহূর্ত
নামাজ শেষ হওয়ার পর থেকেই শুরু হয় হজের সবচেয়ে বড় রুকন—‘উকুফ’ বা অবস্থান, যা সূর্যাস্ত পর্যন্ত স্থায়ী হয়। উকুফের সময় হাজিদের প্রধান কাজ হলো কেবলামুখী হয়ে, হাত তুলে আল্লাহর দরবারে রোনাজারি করা। রাসূলুল্লাহ (সা.) জাবালে রহমতের পাদদেশে উটের পিঠে চড়ে কেবলামুখী হয়ে হাত তুলে দীর্ঘক্ষণ মোনাজাত করেছিলেন, এমনকী তাঁর উটের লাগাম পড়ে গেলেও তিনি এক হাতে লাগাম ধরে অন্য হাত আকাশের দিকে তুলে দোয়া করছিলেন। রাসূল (সা.) বলেছেন: “শ্রেষ্ঠ দোয়া হলো আরাফাহর দিনের দোয়া। আর আমি ও আমার পূর্ববর্তী নবীদের শ্রেষ্ঠ জিকির হলো—
لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ المُلْكُ وَلَهُ الحَمْدُ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
অর্থ: “আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরিক নেই, রাজত্ব একমাত্র তাঁরই এবং সমস্ত প্রশংসাও তাঁরই, আর তিনি সব বিষয়ের ওপর ক্ষমতাবান।” (সুনান আত–তিরমিজি)।
৬. সূর্যাস্তের পর: মাগরিব না পড়ে মুজদালিফার উদ্দেশ্যে রওনা
৯ই জিলহজ সূর্যাস্ত হওয়ার সাথে সাথেই আরাফাহর অবস্থান শেষ হয়। তবে এখানে অত্যন্ত কঠোর একটি বিধান হলো—সূর্য ডোবার পর হাজিরা আরাফাহর ময়দানে মাগরিবের নামাজ পড়বেন না। সূর্যাস্তের পূর্বে কোনো হাজির জন্য আরাফাহর সীমানা ত্যাগ করা নিষেধ; যদি কেউ সূর্যাস্তের আগে সীমানা পার হয়, তবে তাকে ‘দম’ বা কোরবানি কাফফারা হিসেবে দিতে হয়। হাজিরা খুব ধীরস্থিরভাবে ‘মুজদালিফা’-র উদ্দেশ্যে রওনা হন এবং রাতের বেলা সেখানে পৌঁছে মাগরিব ও এশার নামাজ একত্রে (জমউত তাখীর) আদায় করেন এবং খোলা আকাশের নিচে রাত যাপন করেন।
৯ই জিলহজের কুরআন ও হাদিসের এই পূর্ণাঙ্গ বিধান ও আহকাম প্রমাণ করে যে, এটি কেবল কোনো আনুষ্ঠানিক যাত্রা নয়। সেদিন হাজিরা তাঁদের সব অহংকার ধুলোর সাথে মিশিয়ে ধরিত্রীর সবচেয়ে পরম ইবাদতে মগ্ন হন। এই দিনের ত্যাগ ও রোনাজারির মধ্য দিয়েই একজন হাজি তাঁর জীবনের সব পাপ ধুয়ে একটি নিষ্পাপ ও পবিত্র নতুন জীবন লাভ করেন।


















