মোঃ মারজান উল ইসলাম
হজ্জ কেবল একটি সফর নয়, বরং এটি আল্লাহর প্রতি পরম আত্মসমর্পণ এবং ইব্রাহিমী ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণ। নিচে আরও বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
১. পবিত্র কুরআনের আলোকে হজ্জের ফজিলত
কুরআনে হজ্জকে আল্লাহর নির্দেশ এবং মানুষের জন্য মহান কল্যাণ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
আল্লাহর ঘর জিয়ারতের নির্দেশ: সূরা আল-ইমরানে আল্লাহ বলেন,“মানুষের মধ্যে যারা সেখানে (বায়তুল্লাহ) যাওয়ার সামর্থ্য রাখে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ওই ঘরের হজ্জ করা তাদের ওপর আবশ্যক।“ (সূরা আল-ইমরান, আয়াত: ৯৭) এখানে হজ্জকে সামর্থ্যবানদের জন্য একটি সরাসরি ‘হক’ বা পাওনা হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে।
পার্থিব ও পারলৌকিক কল্যাণ: সূরা হজ্জে বলা হয়েছে,“যাতে তারা তাদের কল্যাণের স্থানগুলোতে উপস্থিত হতে পারে…” (সূরা হজ্জ, আয়াত: ২৮) মুফাসসিরিনদের মতে, এই ‘কল্যাণ’ বলতে একদিকে যেমন ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিশ্ব মুসলিমের সাথে ঐক্য বোঝায়, অন্যদিকে ইবাদতের মাধ্যমে পরকালীন পাথেয় অর্জনকেও বোঝায়।
তাকওয়া অর্জন: হজ্জের বিভিন্ন আহকাম (যেমন কোরবানি) সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “এগুলোর গোশত বা রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া (খোদাভীতি)।“ (সূরা হজ্জ, আয়াত: ৩৭)
২. হাদীস শরীফের আলোকে বিস্তারিত ফজিলত
রাসূলুল্লাহ (সা.) বিভিন্ন সময়ে হজ্জের ফজিলত সম্পর্কে উম্মতকে উৎসাহিত করেছেন।
ক. গুনাহ থেকে সম্পূর্ণ পবিত্রতা : হজ্জের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো আত্মিক শুদ্ধি। রাসূল (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হজ্জ করল এবং তাতে কোনো প্রকার অশ্লীল কথা বা কাজ এবং পাপাচার করল না, সে হজ্জ থেকে ফিরল সেই দিনের মতো নিষ্পাপ হয়ে, যেদিন তার মা তাকে জন্ম দিয়েছিলেন।” (বুখারী ও মুসলিম)
খ. জান্নাতই একমাত্র পুরস্কার: হজ্জে মাবরুর বা কবুল হজ্জের মর্যাদা সম্পর্কে হাদীসে এসেছে,“উমরাহ পরবর্তী উমরাহ পর্যন্ত মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহের কাফফারা স্বরূপ। আর হজ্জে মাবরুরের বিনিময় জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়।” (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৭৭৩)
গ. আল্লাহর বিশেষ মেহমান (দুআ কবুলের সুযোগ): রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “হজ্জ ও উমরাহ পালনকারীরা হলো আল্লাহর প্রতিনিধি দল (মেহমান)। তারা যদি তাঁকে ডাকে (দুআ করে), তিনি তাদের ডাকে সাড়া দেন। আর যদি তারা তাঁর কাছে ক্ষমা চায়, তবে তিনি তাদের ক্ষমা করে দেন।” (ইবনে মাজাহ)
ঘ. জিহাদের সমতুল্য মর্যাদা: একবার হযরত আয়েশা (রা.) রাসূল (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, আমরা কি আপনাদের সাথে জিহাদ ও যুদ্ধে অংশগ্রহণ করব না? তখন রাসূল (সা.) বললেন,“তোমাদের (নারীদের) জন্য সর্বোত্তম ও শ্রেষ্ঠ জিহাদ হলো হজ্জ, যা আল্লাহর নিকট মকবুল।” (সহীহ বুখারী)
৩. হজ্জের আধ্যাত্মিক ও সামাজিক গুরুত্ব
সাম্যের শিক্ষা: হজ্জের সময় ধনী-দরিদ্র, রাজা-প্রজা সবাই একই সাদা সেলাইবিহীন কাপড় (এহরাম) পরিধান করে। এটি স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আল্লাহর কাছে আভিজাত্যের কোনো মূল্য নেই, কেবল তাকওয়ার মূল্য আছে।
আখেরাতের মহড়া: আরাফাতের ময়দানে লক্ষ লক্ষ মানুষের সাদা পোশাক পরিহিত সমাবেশ কিয়ামতের ময়দানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এটি মানুষকে মৃত্যু এবং পরবর্তী জীবনের প্রস্তুতির কথা মনে করিয়ে দেয়।
শয়তানের বিরুদ্ধে ঘোষণা: মিনায় জামারাতে পাথর নিক্ষেপ করার মাধ্যমে একজন হাজী মূলত নিজের ভেতরের কুপ্রবৃত্তি এবং শয়তানের প্ররোচনাকে বর্জন করার অঙ্গীকার করেন।
হজ্জ হলো একজন মুমিনের জীবনের শ্রেষ্ঠতম অর্জন। এটি কেবল মক্কায় ঘুরে আসা নয়, বরং নিজের নফসকে জবাই করে আল্লাহর ভালোবাসায় সিক্ত হওয়ার একটি প্রক্রিয়া। হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী, হজ্জ কেবল গুনাহই মোচন করে না, বরং মানুষের অভাব ও দারিদ্র্য দূর করে স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনে।
(চলবে)


















