বাইতুল্লাহর তওয়াফ শেষ করার পর পরই হাজিদের জন্য সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো ‘মাকামে ইব্রাহিম’-এর পেছনে বা তার আশপাশের স্থানে দুই রাকাত নামাজ আদায় করা। এই নামাজকে শরিয়তের পরিভাষায় ‘ওয়াজিবুত্তওয়াফ’ (তওয়াফের ওয়াজিব নামাজ) বলা হয়।
১. মাকামে ইব্রাহিম কী?
‘মাকামে ইব্রাহিম’ হলো বেহেশতি এক অলৌকিক পাথর, যা কাবা ঘর নির্মাণের সময় হযরত ইব্রাহিম (আ.) তাঁর পা রাখার জন্য ব্যবহার করেছিলেন। কাবা শরিফের দেয়াল যখন ধীরে ধীরে উঁচু হচ্ছিল, তখন এই পাথরটি হযরত ইব্রাহিম (আ.)-কে ওপরে উঠিয়ে দিত। পাথরটিতে আজও হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর দুই পায়ের ছাপ স্পষ্ট দেখা যায়। বর্তমানে এই পবিত্র পাথরটি কাবা শরিফের কাছে একটি সুদৃশ্য সোনালী কাচের বাক্সে সুরক্ষিত রাখা হয়েছে।
২. পবিত্র কুরআনের নির্দেশ ও নামাজের গুরুত্ব
এই স্থানে নামাজ আদায়ের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে সরাসরি নির্দেশ দিয়ে এর গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে: “আর তোমরা মাকামে ইব্রাহিমকে নামাজের স্থান হিসেবে গ্রহণ করো।“ (সূরা বাকারা, আয়াত: ১২৫)।
হাদিস ও ইতিহাসের বর্ণনা অনুযায়ী, হযরত উমর (রা.) একবার রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি মাকামে ইব্রাহিমকে নামাজের স্থান বানাবো না?” এরপরই আল্লাহ তাআলা এই আয়াতটি নাজিল করেন। সুতরাং, তওয়াফ শেষে এখানে নামাজ পড়া কেবল একটি সাধারণ আমল নয়, বরং এটি সরাসরি আল্লাহর একটি ওয়াজিব আদেশ।
৩. নামাজ আদায়ের সঠিক নিয়ম
স্থান নির্ধারণ: তওয়াফের চক্কর শেষ করে মাকামে ইব্রাহিমকে নিজের এবং কাবা ঘরের মাঝখানে রাখতে হয়। অর্থাৎ, মাকামে ইব্রাহিমের ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে কাবামুখী হয়ে নামাজ পড়া সবচেয়ে উত্তম।
ভিড়ের সময় করণীয়: যদি মাকামে ইব্রাহিমের ঠিক পেছনে প্রচণ্ড ভিড় থাকে এবং সেখানে নামাজ পড়তে গেলে অন্য হাজিদের তওয়াফে বিঘ্ন ঘটে, তবে জোরপূর্বক সেখানে দাঁড়ানোর প্রয়োজন নেই। মসজিদুল হারামের যেকোনো স্থানে বা কাতারেই এই দুই রাকাত নামাজ পড়ে নিলে তা আদায় হয়ে যাবে।
সূরা পাঠের সুন্নাহ: এই নামাজের প্রথম রাকাতে সূরা ফাতিহার পর সূরা কাফিরুন (ক্বুল ইয়া আইয়ুহাল কাফিরুন) এবং দ্বিতীয় রাকাতে সূরা ফাতিহার পর সূরা ইখলাস (ক্বুল হুওয়াল্লাহু আহাদ) পাঠ করা সুন্নাহ।
৪. নামাজ শেষে দোয়া ও জমজমের পানি
রাসূলুল্লাহ (সা.) মাকামে ইব্রাহিমে এই দুই রাকাত নামাজ শেষ করার পর মুলতাজামে (কাবার দেয়ালের একটি বিশেষ অংশ) এসে আল্লাহর দরবারে অশ্রুসিক্ত নয়নে দোয়া করতেন। এরপর তিনি তৃপ্তি সহকারে পেট ভরে জমজমের পানি পান করতেন।
মাকামে ইব্রাহিমের কাছে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায়ের মূল শিক্ষা হলো—হজ কেবল অতীতের কিছু স্মৃতির চারন নয়, বরং হযরত ইব্রাহিম (আ.) যেভাবে নিজের আরাম-আয়েশ বিসর্জন দিয়ে আল্লাহর হুকুম পালন করেছিলেন, নিজের জীবনকেও ঠিক সেই ত্যাগের রঙে রাঙিয়ে নেওয়ার এক চূড়ান্ত অঙ্গীকার।
(চলবে)


















