হজের পুরো পরিক্রমায় প্রতিটি পরতে পরতে জড়িয়ে আছে অলৌকিকত্ব ও আল্লাহর প্রতি পরম বিশ্বাসের ইতিহাস। মক্কা নগরীর মসজিদুল হারামের ভেতরে অবস্থিত ‘জমজম কূপ’ তেমনি এক ঐশ্বরিক নিদর্শন। হাজার হাজার বছর ধরে কোটি কোটি মানুষ এই পানি পান করছে, কিন্তু আজ পর্যন্ত এর উৎস কখনো শুকিয়ে যায়নি। হজের সফরের সাথে জমজমের পানির সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। পবিত্র কুরআন এবং হাদিস শরিফে এই পানির সৃষ্টি এবং এর মহিমার কথা বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে।
জমজম কূপ সৃষ্টির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
পবিত্র কুরআনে সরাসরি ‘জমজম’ শব্দটি উল্লেখ না থাকলেও এর সৃষ্টির ইতিহাস এবং কাবার আশেপাশের অঞ্চলের দোয়ার কথা চমৎকারভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। হযরত ইব্রাহিম (আ.) যখন আল্লাহর নির্দেশে তাঁর স্ত্রী মা হাজেরা এবং দুগ্ধপোষ্য শিশুপুত্র ইসমাইল (আ.)-কে মক্কার জনমানবহীন, ধূ ধূ মরুভূমিতে রেখে যাচ্ছিলেন, তখন তিনি আল্লাহর কাছে হাত তুলে দোয়া করেছিলেন:
“হে আমাদের প্রতিপালক! আমি আমার বংশধরদের কতককে তোমার সম্মানিত ঘরের (কাবা) নিকট এক শস্যহীন উপত্যকায় বসবাস করালাম…” (সূরা ইব্রাহিম, আয়াত: ৩৭)।
মরুভূমির তীব্র গরমে যখন মা হাজেরার কাছে থাকা পানি ও খাবার শেষ হয়ে গেল, তখন তৃষ্ণার্ত শিশু ইসমাইল পানির জন্য ছটফট করতে লাগলেন। মা হাজেরা সন্তানের এই কষ্ট সইতে না পেরে পানির সন্ধানে সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে সাতবার দৌড়াদৌড়ি করেন। ঠিক তখনই আল্লাহ তাআলা তাঁর বিশেষ কুদরত প্রকাশ করেন। ফেরেশতা জিবরাইল (আ.)-এর পায়ের গোড়ালি বা ডানার আঘাতে মাটি ফেটে পানির তীব্র ধারা বের হতে থাকে। মা হাজেরা পানিকে চারপাশ থেকে বালি দিয়ে আটকে দেওয়ার সময় বলেছিলেন ‘জমজম’ (যার অর্থ—থামো থামো)। এভাবেই এই বরকতময় কূপের সৃষ্টি হয়, যা আজও বিশ্ব মুসলিমের জন্য এক বিস্ময়।
হাদিসের আলোকে জমজমের গুরুত্ব ও ফজিলত
রাসূলুল্লাহ (সা.) জমজমের পানির অসংখ্য গুণাগুণ ও ফজিলত বর্ণনা করেছেন। এর মধ্যে প্রধান কয়েকটি হলো:
১. নিয়ত অনুযায়ী ফল লাভ: জমজমের পানির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এটি যে নিয়তে পান করা হয়, আল্লাহ তাআলা তা পূরণ করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: “জমজমের পানি যে উদ্দেশ্যে পান করা হবে, তা-ই অর্জিত হবে।” (সুনান ইবনে মাজাহ)। কেউ যদি রোগমুক্তির জন্য, জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য বা আখেরাতের কল্যাণের নিয়তে এই পানি পান করে, আল্লাহ তার সেই ইচ্ছা পূরণ করেন।
২. ক্ষুধা ও রোগের মহাঔষধ: জমজমের পানি কেবল তৃষ্ণা মেটায় না, এটি একই সাথে খাদ্য এবং রোগ নিরাময়কারী। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “নিশ্চয়ই এটি বরকতময় পানি এবং এটি ক্ষুধার্ত ব্যক্তির জন্য তৃপ্তিদায়ক খাদ্য এবং অসুস্থতার প্রতিষেধক।” (সহিহ মুসলিম)।
৩. ঈমানের পরিমাপক: মুমিন ও মুনাফিকের মধ্যে পার্থক্য করার একটি মাধ্যম হলো জমজমের পানি। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “আমাদের (মুমিনদের) এবং মুনাফিকদের মধ্যে পার্থক্য হলো—তারা (মুনাফিকরা) পেট ভরে জমজমের পানি পান করতে পারে না।” (সুনান ইবনে মাজাহ)। অর্থাৎ, মুমিনরা এই পানির প্রতি গভীর ভালোবাসা ও বিশ্বাস নিয়ে তৃপ্তি সহকারে এটি পান করে।
জমজমের পানি পানের সুন্নাহ ও আদব
হাদিস অনুযায়ী জমজমের পানি পানের কিছু বিশেষ আদব রয়েছে। যেমন—পবিত্র কাবার দিকে মুখ করে দাঁড়ানো, শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ বলা এবং তিন শ্বাসে পেট ভরে তৃপ্তি সহকারে পান করা। পানি পানের সময় হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) এই দোয়াটি করতেন: “আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা ইলমান নাফিয়া, ওয়া রিজকান ওয়াসিয়া, ওয়া শিফায়াম মিন কুল্লি দা-ই।” (অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে কল্যাণকর জ্ঞান, প্রশস্ত রিজিক এবং সমস্ত রোগ থেকে মুক্তি প্রার্থনা করছি।)
তওয়াফ ও মাকামে ইব্রাহিমে নামাজ শেষে এই বরকতময় পানি পান করা হাজিদের আত্মাকে এক পরম শান্তিতে ভরিয়ে দেয়। এটি কেবল একটি পানির কূপ নয়, বরং আল্লাহর প্রতি মা হাজেরার অবিচল বিশ্বাসের এক চিরন্তন পুরস্কার।
(চলবে)

















