এহরামের বিধান ও সফরের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে একজন হাজী যখন পবিত্র মক্কা নগরীর সীমানায় পৌঁছান, তখন তার অন্তরে সৃষ্টি হয় এক অপূর্ব আধ্যাত্মিক আকুলতা। মক্কা হলো পৃথিবীর বুকে আল্লাহর সবচেয়ে নিরাপদ এবং মর্যাদাপূর্ণ স্থান। এই পবিত্র ভূমিতে পা রাখার পর একজন মুমিনের প্রথম ও প্রধান করণীয় বিষয়গুলো কুরআন ও হাদিসের আলোকে জেনে নেওয়া জরুরি।
১. বিনম্রভাবে মক্কায় প্রবেশ
মক্কা হলো আল্লাহর পবিত্র ‘হারাম’ বা সুরক্ষিত অঞ্চল। রাসূলুল্লাহ (সা.) যখনই মক্কায় প্রবেশ করতেন, অত্যন্ত বিনয় ও নম্রতার সাথে শান্তিসূচক দোয়া পড়তে পড়তে প্রবেশ করতেন। অহংকার বা তাড়াহুড়ো না করে, আল্লাহর ঘরের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করে এই পবিত্র নগরীতে প্রবেশ করা প্রতিটি হাজীর প্রথম দায়িত্ব।
২. মসজিদুল হারামে প্রবেশ ও প্রথম দর্শন
মসজিদুল হারামে ডান পা দিয়ে প্রবেশ করা এবং মসজিদে প্রবেশের সুন্নাহসম্মত দোয়া পড়া উচিত। এরপর যখনই প্রথম পবিত্র কাবা শরিফের ওপর নজর পড়বে, তখন দু’হাত তুলে দোয়া করা সুন্নাহ। হাদিসে এসেছে, কাবা শরিফ প্রথম দেখার পর মুমিনের যেকোনো দোয়া আল্লাহ তাআলা কবুল করেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই মানবজাতির জন্য সর্বপ্রথম যে ঘরটি নির্মিত হয়েছিল, তা হলো মক্কায় অবস্থিত (কাবা)।“ (সূরা আল-ইমরান, আয়াত: ৯৬)। এই ঘরের দিকে গভীর ভালোবাসা ও বিস্ময় নিয়ে তাকানোও একটি বড় ইবাদত।
৩. তওয়াফ: কাবা শরিফ প্রদক্ষিণ
মক্কায় পৌঁছানোর পর সবচেয়ে প্রথম ও প্রধান ইবাদত হলো তওয়াফ করা। হাজরে আসওয়াদ (কালো পাথর) থেকে শুরু করে কাবা ঘরকে বামে রেখে সাতবার প্রদক্ষিণ করাকে তওয়াফ বলে।
কুরআনের নির্দেশ: আল্লাহ তাআলা বলেন, “এবং তারা যেন এই প্রাচীন ঘরের (কাবা) তওয়াফ করে।“ (সূরা হজ, আয়াত: ২৯)।
হাদিসের আলোকচ্ছটা: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি নিখুঁতভাবে কাবা ঘর সাতবার তওয়াফ করবে এবং এরপর দুই রাকাত নামাজ আদায় করবে, সে একজন দাস মুক্ত করার সমতুল্য সওয়াব পাবে।“তওয়াফের প্রস্তুতি ও ওজু
তওয়াফ শুরু করার আগে দুটি বিষয় নিশ্চিত করতে হয়:
পবিত্রতা (ওজু): নামাজ আদায়ের জন্য যেমন ওজু ফরজ, তেমনি তওয়াফ করার জন্যও ওজু করা আবশ্যক। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তওয়াফ হলো নামাজের মতোই, তবে পার্থক্য এই যে—তওয়াফে কথা বলা যায়।” (জামে তিরমিজি)। তাই তওয়াফ অবস্থায় অনর্থক কথা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে।
ইদতিবা (পুরুষদের জন্য): ইহরামের ওপরের চাদরটি ডান বগলের নিচ দিয়ে এনে বাম কাঁধের ওপর রাখা, যাতে ডান কাঁধ খোলা থাকে। একে ইদতিবা বলে। পুরো তওয়াফে এভাবে চাদর রাখতে হয়।
হাজরে আসওয়াদ থেকে শুরু ও ইস্তিলাম
তওয়াফ শুরু করতে হয় কাবার কোণে অবস্থিত ‘হাজরে আসওয়াদ’ (বেহেশতি কালো পাথর) থেকে। কাবার যে কোণায় এই পাথরটি আছে, সেখানে মেঝেতে একটি সবুজ বাতি বা দাগ দেওয়া থাকে।
তওয়াফ শুরুর সময় হাজরে আসওয়াদের দিকে মুখ করে দুই হাত কান পর্যন্ত উঠিয়ে ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলে তওয়াফ শুরু করতে হয়।
সম্ভব হলে পাথরে চুমু খেতে হয়, আর ভিড়ের কারণে সম্ভব না হলে দূর থেকে হাত উঁচিয়ে ইশারা করতে হয়, যাকে ‘ইস্তিলাম’ বলে।
৩. রমল বা বীরদর্পে চলা
তওয়াফের প্রথম তিন চক্করে পুরুষদের একটু বুক ফুলিয়ে, কাঁধ দুলিয়ে দ্রুত পায়ে চলতে হয়, একে ‘রমল’ বলা হয়। এটি মূলত ইসলামের প্রথম যুগে কাফেরদের শক্তি প্রদর্শনের জন্য নবীজি (সা.) করেছিলেন, যা আজ হজের সুন্নাহ। বাকি চার চক্কর স্বাভাবিক গতিতে হাঁটতে হয়। নারীদের জন্য রমল বা ইদতিবা নেই, তারা স্বাভাবিকভাবেই তওয়াফ করবেন।
(চলবে)


















