ভোর সাড়ে পাঁচটা। সূর্য পুরোপুরি আকাশে ওঠেনি। জনাকীর্ণ তাঁবুর মধ্যে ঘুম ভেঙেছে ১৫ বছর বয়সী মাহমুদের। তবে স্কুলব্যাগের দিকে এগিয়ে গেল না সে। বরং হাতে নিল একটি বস্তা। বলল, ‘এখন বস্তাটা খালি। ভরে যাওয়ার আগেই আমি এর ওজন টের পাচ্ছি। হাঁটা শুরু করার আগেই আমার পিঠে ব্যথা শুরু হয়।’
পথে কার্ডবোর্ড, পলিথিন, কাঠ—এমন সব বাতিল জঞ্জাল, যা পাবে সব সংগ্রহ করবে মাহমুদ। তারপর বাসায় ফেরা। মাহমুদের ভাষায়, ‘কখনো কখনো ছয় ঘণ্টা হেঁটে আমি মাত্র কয়েক টুকরা কাঠ পাই। ময়লা–আবর্জনার ধুলাবালি আমার ফুসফুসের ভেতের ঢুকে যায়। সারা রাত কাশি হয়। তবে করার কিছু নেই। রুটি তৈরির জন্য কোনো আগুন নেই।’
পরিবারের জন্য মাহমুদের গভীর দায়িত্ববোধ রয়েছে। গত বছরের শুরুর দিকে ইসরায়েলের হামলায় তার বাবার মৃত্যু হয়েছিল। ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামলা শুরুর পর থেকে তাঁকে নিয়ে ৭০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বাসার বড় ছেলে মাহমুদ। অভাবের সংসারে তাই সে জানে তাকে কী করতে হবে। বয়স কম তাতে কী এসে যায়।
তবে মাহমুদ এ–ও জানে, তার জীবনটা অন্য রকম হতে পারত। স্কুলের দিনগুলোর কথা মনে পড়ে তার। সে বলল, ‘যুদ্ধের আগে আমি স্কুলে যেতাম। বাবা তখন বেঁচে ছিলেন। মাঝেমধ্যে যখন বস্তা নিয়ে বাজারের ভেতর দিয়ে যাই, তখন আমার গণিতের শিক্ষকের সঙ্গে দেখা হয়। তাঁকে এভাবে দেখতে ভালো লাগে না। আমি তাঁর একজন সেরা ছাত্র ছিলাম।’
দুই বছর ধরে টানা ইসরায়েলের হামলায় গাজা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘের হিসাবে, এ সময় গাজায় ৯৭ শতাংশের বেশি স্কুল হয় ধ্বংস হয়ে গেছে, না হয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুই বছরের বেশি সময় ধরে গাজায় স্কুলগামী ৬ লাখ ৫৮ হাজার শিশুর বেশির ভাগই পড়াশোনার সুযোগবঞ্চিত হয়েছে। এমনকি গত অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি শুরুর পর স্কুলগুলো ঠিকভাবে খোলেনি।
গাজার ঠিক কত শতাংশ শিশুকে পড়াশোনা ছেড়ে কাজে নামতে হয়েছে, তার কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তবে উপত্যকাটিতে বসবাসকারী ফিলিস্তিনিদের ভাষ্যমতে, এমন শিশুর সংখ্যা বহুগুণে বেড়েছে। মনোবিজ্ঞানী ইয়াকিন জামাল বলেন, ‘গাজায় আমরা যা দেখছি, তা শুধু শিশুশ্রম নয়, এটি একটি পুরো প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে পদ্ধতিগতভাবে ধ্বংস করে দেওয়া।’
সূত্র – প্রথম আলো


















