রবিবার , ২৪ মে ২০২৬ | ২০শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
  1. Bangladesh
  2. Economics
  3. English version
  4. National
  5. Politics
  6. World News
  7. অন্যান্য
  8. অপরাধ
  9. অর্থনীতি
  10. আইন-আদালত
  11. আন্তর্জাতিক
  12. আবহাওয়া
  13. এক্সক্লুসিভ নিউজ
  14. কলাম
  15. কৃষি

আল-কুরআন ও হাদিসের আলোকে ইব্রাহিমী কোরবানি ও হাজিদের পূর্ণাঙ্গ করণীয়

প্রতিবেদক
সভ্যতার আলো ডেস্ক
মে ২৪, ২০২৬ ১০:৫৯ অপরাহ্ণ

১. আল-কুরআনের আলোকে হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর স্বপ্ন আল্লাহর পরীক্ষা

১০ই জিলহজ বা ‘ইয়াওমুন্নাহর’ কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিন নয়, বরং এটি আদি পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ.) এবং তাঁর পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)-এর জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষার এক শাশ্বত স্মারক। পবিত্র কুরআনের সূরা আস-সাফফাত-এ এই ত্যাগের মহিমান্বিত ঘটনাটি অত্যন্ত চমৎকারভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। হযরত ইব্রাহিম (আ.) বৃদ্ধ বয়সে আল্লাহর দরবারে এক সৎপুত্রের জন্য দোয়া করেছিলেন এবং আল্লাহ তাঁর দোয়া কবুল করে তাঁকে এক ধৈর্যশীল পুত্রের (ইসমাইল) সুসংবাদ দেন।

পুত্র যখন পিতার সাথে চলাফেরা করার বয়সে উপনীত হলো, তখন হযরত ইব্রাহিম (আ.) স্বপ্নে দেখলেন যে তিনি তাঁর প্রাণপ্রিয় পুত্রকে নিজের হাতে জবেহ করছেন। নবীদের স্বপ্ন ওহীর অন্তর্ভুক্ত, তাই এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি সরাসরি নির্দেশ ছিল।

আল্লাহ তাআলা ইব্রাহিম (আ.)-এর জবানীতে কুরআনে ইরশাদ করেন:

يَا بُنَيَّ إِنِّي أَرَىٰ فِي الْمَنَامِ أَنِّي أَذْبَحُكَ فَانظُرْ مَاذَا تَرَىٰ

অর্থ: “হে বৎস! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে আমি তোমাকে জবেহ করছি, এখন বলো তোমার অভিমত কী?” (সূরা আস-সাফফাত, আয়াত: ১০২)

২. হযরত ইসমাইল (আ.)-এর অবিচল ঈমান আত্মসমর্পণ

পিতার মুখে এই কঠিন স্বপ্নের কথা শুনে বালক ইসমাইল (আ.) বিন্দুমাত্র বিচলিত বা ভীত হননি। তিনি জানতেন যে এটি আল্লাহর নির্দেশ, আর আল্লাহর Genuine আদেশের সামনে একজন মুমিনের একমাত্র কাজ হলো সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করা। তিনি অত্যন্ত শান্ত ও দৃঢ় চিত্তে পিতাকে উত্তর দিয়েছিলেন, যা পবিত্র কুরআনে এভাবে বর্ণিত হয়েছে: “সে বলল, হে আমার পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে আপনি তাই করুন। ইনশাআল্লাহ, আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।” (সূরা আস-সাফফাত, আয়াত: ১০২)। এই জবাবের মধ্য দিয়ে হযরত ইসমাইল (আ.) ইতিহাসের বুকে চরম আনুগত্য ও ধৈর্যশীলতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

৩. মিনার পথে শয়তানের প্ররোচনা পাথর নিক্ষেপের ঐতিহাসিক সূচনা

সহীহ হাদিস এবং তাফসীরের বর্ণনা অনুযায়ী, ১০ই জিলহজ সকালে হযরত ইব্রাহিম (আ.) তাঁর পুত্রকে জবেহ করার জন্য মিনার দিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন। মুসনাদে আহমাদ-এর বর্ণনা মতে, এই পথে যাওয়ার সময় অভিশপ্ত শয়তান মানুষের রূপ ধরে তিনবার হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর মনে কুপ্ররোচনা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। হযরত ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহর আদেশে প্রতিবারই শয়তানকে লক্ষ্য করে সাতটি করে পাথর কুচি নিক্ষেপ করেন এবং তাকে মাটির নিচে ধসিয়ে দেন। পিতা-পুত্রের এই অটল বিশ্বাসের কারণেই আজ হজে আগত সমস্ত হাজির জন্য মিনায় ‘জামারাত’ বা শয়তানকে পাথর মারা ওয়াজিব করা হয়েছে।

৪. জবেহ করার চূড়ান্ত মুহূর্ত জান্নাতি দুম্বা লাভ

অতঃপর পিতা ও পুত্র যখন মিনার কুরবানির স্থানে পৌঁছালেন, তখন হযরত ইব্রাহিম (আ.) তাঁর পুত্রকে কাত করে শুইয়ে দিলেন এবং পুত্রের গাল মাটিতে রেখে ধারালো ছুরি চালালেন। কিন্তু আল্লাহর অলৌকিক কুদরতে ছুরি ইসমাইলের গলার একটি পшমও কাটতে পারল না। আল্লাহ তাআলা ইব্রাহিম (আ.)-এর এই চরম ভালোবাসার পরীক্ষা দেখে অত্যন্ত সন্তুষ্ট হলেন এবং আকাশ থেকে আওয়াজ দিলেন: “হে ইব্রাহিম! তুমি তো স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখালে। নিশ্চয়ই আমি সৎকর্মশীলদের এভাবেই পুরস্কৃত করে থাকি।” (সূরা আস-সাফফাত, আয়াত: ১০৪-১০৫)। আল্লাহ জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে জান্নাত থেকে একটি হৃষ্টপুষ্ট দুম্বা পাঠালেন এবং ইসমাইল (আ.)-এর পরিবর্তে সেটি জবেহ হলো। আল্লাহ ইসমাইল (আ.)-কে বাঁচিয়ে দিলেন এবং এই কোরবানিকে কিয়ামত পর্যন্ত উম্মতের জন্য ইবাদত হিসেবে জারি করে দিলেন।

১০ই জিলহজ হজের ময়দানে হাজিদের সুনির্দিষ্ট করণীয়সমূহ

১০ই জিলহজের এই মহান ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বুকে ধারণ করে হাজিগণকে এই দিনে ধারাবাহিকভাবে নিচের প্রধান আমলগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সম্পন্ন করতে হয়:

১. মুজদালিফায় ফজর নামাজ মিনায় প্রত্যাবর্তন ১০ই জিলহজ হাজির সর্বপ্রথম আমলটি শুরু হয় মুজদালিফার খোলা ময়দানে। হাজিগণ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে মুজদালিফায় ফজরের নামাজ প্রথম ওয়াক্তে আদায় করেন এবং আকাশ ফর্সা হওয়া পর্যন্ত দীর্ঘ দোয়া ও জিকির করেন। এরপর সূর্য সম্পূর্ণ উদিত হওয়ার ঠিক পূর্বে, হাজিগণ মিনার উদ্দেশ্যে রওনা হন।

২. জামারাতুল আকাবায় (বড় শয়তান) পাথর নিক্ষেপ মিনায় পৌঁছানোর পর ১০ই জিলহজের সর্বপ্রথম প্রধান কাজ হলো বড় শয়তানকে (জামারাতুল আকাবা) পাথর নিক্ষেপ করা। হাজিগণ মুজদালিফা থেকে সংগ্রহ করা ছোট ছোট ৭টি কঙ্কর বা পাথর খণ্ড রাসুলের সুন্নাত অনুযায়ী একে একে নিক্ষেপ করেন। প্রতিটি পাথর নিক্ষেপের সময় উচ্চকণ্ঠে বলতে হয়— ‘আল্লাহু আকবার’। প্রথম পাথরটি নিক্ষেপ করার সাথে সাথেই হজের দীর্ঘ সফরের প্রধান জিকির ‘তালবিয়া’ (লাব্বাইক…) পাঠ বন্ধ করে দিতে হয়। (সহীহ মুসলিম)।

৩. পশু কোরবানি সম্পন্ন করা বড় শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ শেষ করার পর হাজিদের দ্বিতীয় কাজ হলো আল্লাহর নামে পশু কোরবানি করা। হযরত ইব্রাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.)-এর সেই মহান আত্মসমর্পণকে স্মরণ করে হাজিগণ এই কোরবানি দেন। যারা হজে তামাত্তু বা কিরান করেন, তাদের জন্য এই কোরবানি করা ওয়াজিব বা বাধ্যতামূলক।

৪. মাথা মুণ্ডন বা চুল ছোট করা (হলক বা কসর) কোরবানি সম্পন্ন হওয়ার পর তৃতীয় কাজ হলো মাথা মুণ্ডন করা (হলক) অথবা চুল ছোট করা (কসর)। পুরুষদের জন্য পুরো মাথা মুণ্ডন করা উত্তম। মাথা মুণ্ডনের পর হাজিগণ ইহরামের কাপড় খুলে সাধারণ পোশাক পরিধান করতে পারেন এবং স্ত্রী সহবাস ছাড়া ইহরামের অন্য সব নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়, যাকে ‘তাহাল্লুলে আউয়াল’ বা প্রথম হালাল হওয়া বলে। (সহীহ বুখারী)।

৫. মক্কায় গিয়ে তওয়াফে জিয়ারাহ সাঈ সম্পন্ন করা মিনায় চুল কাটার পর হাজিগণ মক্কায় কাবা শরিফে গিয়ে হজের অন্যতম প্রধান ফরজ ‘তওয়াফে জিয়ারাহ’ সম্পন্ন করেন। কাবার চারপাশ সাতবার প্রদক্ষিণ এবং মাকামে ইব্রাহিমে দুই রাকাত নামাজ আদায়ের পর হাজিগণ সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে গিয়ে হজের সাঈ সম্পন্ন করেন। এই তওয়াফ ও সাঈ শেষ হওয়ার পর হাজিদের ওপর থেকে স্ত্রী সহবাসসহ ইহরামের শেষ বাধ্যবাধকতাটিও চিরতরে উঠে যায়, যাকে ‘তাহাল্লুলে সানি’ বা পূর্ণ হালাল হওয়া বলে। তওয়াফ শেষে হাজিগণ পুনরায় মিনার তাঁবুতে ফিরে আসেন পরবর্তী দিনগুলোর রাত্রিযাপনের জন্য।

১০ই জিলহজের এই সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনা এবং ধারাবাহিক আমলগুলো প্রমাণ করে যে, এটি হাজির শারীরিক ও মানসিক ধৈর্যের এক চরম পরীক্ষা। পাথর নিক্ষেপ, কোরবানি, চুল কাটা এবং তওয়াফের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর আদেশের সামনে নিজের অহংকার ও আমিত্বকে সম্পূর্ণ বিসর্জন দেয়। কুরআন ও হাদিসের এই মহান বিধানগুলো অনুসরণের মাধ্যমেই একজন হাজি তাঁর হজের চূড়ান্ত পূর্ণতা ও আল্লাহর অপার সন্তুষ্টি লাভ করেন।

 

সর্বশেষ - মুন্সীগঞ্জ