ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ কমাতে নতুন করে ছাড় দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে এখন থেকে ডাউন পেমেন্ট বা এককালীন জমার মাত্র ১ শতাংশ পরিমাণ অর্থ জমা দিয়েই ঋণ পুনঃ তফসিলকরণ সুবিধা নেওয়া যাবে। পাশাপাশি পুনঃ তফসিল বাস্তবায়নে আরও তিন মাস পর্যন্ত সময় বাড়ানোর সুযোগ রাখা হয়েছে।
যাঁরা এককালীন অর্থ জমা দিতে না পেরে ঋণ নবায়ন করতে পারছিলেন না, তাঁরা এখন ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ পাবেন। গতকাল রোববার এক চিঠিতে ব্যাংকগুলোকে এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের চিঠিতে বলা হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা ও আর্থিক কাঠামো পুনর্গঠনের লক্ষ্যে নীতি সহায়তা প্রদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন তফসিলি ব্যাংক ও খাতসংশ্লিষ্টদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ঋণ পুনঃ তফসিল ও এককালীন পরিশোধের ক্ষেত্রে যে এককালীন অর্থ (২ শতাংশ) জমা দিতে হয়, তার অর্ধেক আবেদনের সঙ্গে এবং বাকি অর্ধেক ছয় মাসের মধ্যে পরিশোধ করা যাবে। ইতিমধ্যে নীতি সহায়তা দেওয়া হলেও তা যৌক্তিক কোনো কারণে বাস্তবায়ন সম্ভব না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক পূর্বনির্ধারিত সময়সীমার অতিরিক্ত আরও তিন মাস সময় বাড়াতে পারবে।
সুদ মওকুফের বিষয় বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ বিদ্যমান নীতিমালার আওতায় ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যবসা করতে গিয়ে সমস্যায় পড়েছে অথবা মার্কিন ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এমন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আবার সচল করতে বাংলাদেশ ব্যাংক আগে ২ শতাংশ অর্থ জমা দিয়ে খেলাপি ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ দিয়েছিল। ওই ঋণের মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর। ঋণ নিয়মিত হলে শুরুতে দুই বছর পরিশোধে বিরতি সুবিধা পাওয়া যাবে।
নীতিমালা অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের আবেদন পাওয়ার ছয় মাসের মধ্যে ব্যাংককে তা নিষ্পত্তি করতে হবে। ঋণ পুনঃ তফসিলের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। একইভাবে এককালীন ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রেও এক বছর সময় পাবেন গ্রাহকেরা। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তি নেওয়ার প্রয়োজন হবে না। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে চাপে থাকা ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা পাবেন।
—এককালীন জমার ১ শতাংশ দিলেই ঋণ পুনঃ তফসিলের সুযোগ।
—খেলাপি ঋণের হারে শীর্ষ পাঁচ ব্যাংকে এই হার ৯১–৯৬ শতাংশ।
—ব্যাংক খাতের দেওয়া ১৭.৪১ লাখ কোটি টাকার ঋণের ৩৬.৩% এখন খেলাপি।
এককালীন পরিশোধের ক্ষেত্রে গ্রাহকদের ঋণের স্থিতির ৫ শতাংশ অর্থ জমা দিয়ে আবেদন করতে হবে। শুরুতে ১০ শতাংশ জমা দিয়ে আবেদন করতে হতো। পরে নীতিমালা সংশোধন করে ৫ শতাংশে নামানো হয়, যাতে ব্যবসায়ীরা সহজে সুবিধা নিতে পারেন।
মূল ঋণ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত হলে এক্সিট সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কমিটি সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। ঋণের পরিমাণ ২০ লাখ টাকার বেশি হলে পরিচালনা পর্ষদ বা নির্বাহী কমিটি সিদ্ধান্ত নেবে। ভবিষ্যতে আদায়ের সম্ভাবনা ক্ষীণ, এমন বিরূপভাবে শ্রেণীকৃত ঋণ আদায় ও নিয়ন্ত্রণের বাইরের কোনো কারণে প্রকল্প বা ব্যবসা বন্ধ হলে অথবা ঋণগ্রহীতার পক্ষ থেকে প্রকল্প বা ব্যবসা বন্ধের ক্ষেত্রে এ প্রস্থান সুবিধা দেওয়া যাবে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
খেলাপি ঋণের পরিস্থিতি
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ৪১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩৬ দশমিক ৩ শতাংশ ঋণই খেলাপি।
ব্যাংকারদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে ব্যাংক খাতে অনিয়ম, জালিয়াতি, প্রতারণা ও দুর্নীতির উচ্চমাত্রার প্রভাবই খেলাপি ঋণের এ চিত্রে প্রতিফলিত হয়েছে। এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, হল-মার্ক গ্রুপসহ আরও কয়েকটি গ্রুপ এবং বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির ঘটনায় খেলাপি ঋণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
খেলাপির দিক থেকে শীর্ষ পাঁচ ব্যাংক হলো ইউনিয়ন, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল, পদ্মা ও আইসিবি ইসলামী ব্যাংক। ইউনিয়ন ব্যাংকের খেলাপির হার ৯৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ৯৬ দশমিক ২০ শতাংশ, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ৯৫ দশমিক ৭০ শতাংশ, পদ্মা ব্যাংকের ৯৪ দশমিক ১৭ শতাংশ এবং আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের ৯১ দশমিক ৩৮ শতাংশ।
সূত্র- প্রথম আলো


















