কমরেড মুনীর মোর্শেদ: আজিজ মার্কেটে ঘাস ফুল নদী’র সূচনালগ্নে যে ক’জন মানুষ আড্ডায় সমবেত হয়েছিলেন , তাঁদের মধ্যে ভরা যৌবন সাজাহান সরদার ছিলেন সবচেয়ে প্রানবন্ত বৈচিত্র্যময় সবচে অগ্রসর। তাঁর ঠোঁটের কোনে ছিল সম্মোহনী হাসি। তর্কের টেবিলে সবাই যখন তুমুল উত্তেজিত, তখন তিনি ছিলেন মৌন শান্ত । তথ্য-উপাত্ত , যুক্তি দিয়ে খণ্ডন করছেন বিরোধীদের ভ্রান্ত বচন।বিনয়ী, উদার হলেও যুক্তির ক্ষেত্রে অনঢ়,অটল। ছাড় দিতেন না কাউকে।
সাজাহান ভাই আর আমি একই এলাকার মানুষ। ইতিহাস শোভিত মুন্সীগঞ্জ সদরে তাঁর জন্মভিটা আর আমার লৌহজং উপজেলায়। ৭০ দশকে লৌহজং থেকে মহকুমা সদর মুন্সীগঞ্জে আসতে সময় লাগত ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা। একমাত্র বাহন ছিল লঞ্চ। ১৯৭৩ সালে আমি যখন কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র তখন মুন্সীগঞ্জ শহরে সাজাহান ভাই’র সাথে আমার প্রথম পরিচয়। আজ তাঁর আর আমার নানা স্মৃতি তরঙ্গ তুলেছে প্রাণের ভেতর। ১৯৭৩ সালে মুন্সীগঞ্জে তারুণ্যের প্রথম প্রভাতে তাঁকে দেখেছি একেবারে অন্যরকম এক সদ্য তরুণ। আমার দুই ক্লাস সিনিয়র। হালকা-পাতলা,লম্বাটে গড়নের শক্ত শরীর। অনুসন্ধিৎসু চোখ। দু’চোখে সমুদ্রের গভীরতা। তখনও এতটা নিবিড় হইনি তাঁর সাথে। আমরা নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ হই দুই দশক পর , আজিজ মার্কেটে ডেরা বাঁধার সময়ে ১৯৯৪ সালে।আমি অসময়ে প্রথম শ্রেণির সরকারি চাকরি ছেড়ে বিপ্লবের স্বপ্নে বিভোর হয়ে প্রথাবিরোধী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ঘাস ফুল নদী নিয়ে কেবল থিতু হয়েছি আজিজ মার্কেটে।সে সময় সাজাহান ভাইও এলেন আজিজে।আগে তাঁকে জানতাম বামপন্থী ছাত্ররাজনীতির একজন ডাকসাইটে সংগঠক হিসেবে। একজন জনপ্রিয় ছাত্রনেতা হিসেবে ৭০ দশকের মধ্যসময়ে নানা আন্দোলন-সংগ্রামে প্রকম্পিত করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস।
আজিজ মার্কেটে তিনি আবির্ভূত হলেন পাখিবিশারদ ও গবেষক হিসেবে। সাহিত্যের ছাত্র বেছে নেন প্রাণিবিজ্ঞানের বিষয়-আশয়।অবশ্য যতটা না পেশা, তার চেয়ে বড় ছিল তাঁর নেশা। পাখি-অন্বেষণে দাফতরিক কাজে ভাড়া নেন ঘাস ফুল নদী লাগোয়া এক কক্ষের একটি ঘর।অচিরেই তাঁর সাথে জুটে যায় আজিজ মার্কেটের আড্ডাবাজ বাম-প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মী,কবি, কথাসাহিত্যিক, চিত্রশিল্পী, চলচ্চিত্রকর্মী, নাট্যকর্মী,ভবঘুরে, বেকার ছাত্র-যুবক।
পাখির খোঁজে দেশ বিদেশ চষে বেড়িয়েছেন । সাফল্যে পৌঁছে হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই হুট করে ফিরে গেলেন জন্ম শহর মুন্সীগঞ্জের সরদার পাড়ায় বাপের ভিটায় । গাছপালা, তরুলতা অক্ষুণ্ণ রেখে তৈরি করলেন
নিসর্গ অঙ্গন। – প্রকৃতি বান্ধব অবকাশ ঠিকানা। সুখের দিনে আবার উড়াল , ডাক এলো অস্ট্রেলিয়া থেকে। পরিবার , পুরনো বন্ধু ও অস্ট্রেলিয়ার পাখপাখালির টানে চলে গেলন সেখানে। পাখি গবেষণা , লেখালেখি আর আড্ডায় দুর্দান্ত নিমগ্ন সময় সময় উপভোগ
করছেন সেখানে। প্রত্নতাত্ত্বিকরা যেভাবে মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে নিদর্শন বের করেন ঠিক তেমনি তিনি বাইনোকুলার টেলিসকোপ ক্যামেরা নিয়ে বন-জঙ্গল পাহাড় সমুদ্র ঘুরে ঘুরে তুলে আনেন পাখির নানা তথ্য উপাত্ত আর ছবি ও গল্প। পাখিকে ঘিরেই তাঁর দিনযাপন, তাঁর আনন্দ-উল্লাস।পাখিই তাঁর একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান।এই সাধনা তাঁর আত্মাকে শীতল
রাখে। সজীব সতেজ প্রাণবন্ত রাখে। ভালো থাকুন সুস্থ থাকুন প্রিয় ভাই, বন্ধু আমার।
লেখক: প্রাবন্ধিক , প্রকাশক- ঘাস ফুল নদী ।


















