ভোরবিহানে একটি পালকি বাড়ির পাশ দিয়ে
যাচ্ছে-আল্লাহ বোল, বোল বলরে, সুরের ছন্দ তুলে। পালকির ভেতরে লাল টকটকে পাটের শাড়ির ভাঁজে অবগুণ্ঠনের আড়ালে দুলহান। বাড়ির বউ-ঝিরা দৌড়ে এসে আঙিনায়
দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য অবগাহন করে। দারুণ উচ্ছ্বাস সকলের চোখেমুখে, বিশেষত পর্দার আড়ালে দুলহানের অবগুণ্ঠন ঢাকা মুখখানি দেখার জন্য। আমি দুলহান দেখতে কাতর ছিলাম না, আমার উৎসাহ ছিল পালকি বাহকদের ওপর, উচু-নিচু পথে আধা দৌড়ের তালে তালে ওদের গান শুনায়। শীত মৌসুমে এমন দৃশ্য মাঝে মধ্যেই দেখা যেত। আমার প্রাইমারি স্কুলের নাম ছিল মণ্ডল বাড়ি ইসকুল। আমাদের বাড়ি থেকে দূরে ছিল না, বিশ মিনিট হাঁটা পথ। স্কুলের পশ্চিম সীমান্তে গণকপাড়া গ্রাম; পূবে কোর্টগাঁ গ্রামের মণ্ডল বাড়ি। ইসকুল চৌহদ্দির ভেতরেই ছিল কে. কে. স্কুল। সে ইস্কুলের উত্তরে সরু মেঠোপথ, পশ্চিমের গ্রামীণ জনপদের সংঙ্গে শহরের যোগাযোগ সড়ক। স্কুল সংলগ্ন
ভোরবিহানে একটি পালকি বাড়ির
পাশ দিয়ে যাচ্ছে-
আল্লাহ বোল
বোল বলরে, সুরের ছন্দ তুলে। পালকির ভেতরে লাল টকটকে পাটের শাড়ির ভাঁজে অবগুণ্ঠনের আড়ালে দুলহান। বাড়ির বউ-ঝিরা দৌড়ে এসে আঙিনায় দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য অবগাহন করে। দারুণ উচ্ছ্বাস সকলের চোখেমুখে, বিশেষত পর্দার আড়ালে দুলহানের অবগুণ্ঠন ঢাকা মুখখানি দেখার জন্য। আমি দুলহান দেখতে কাতর ছিলাম না, আমার উৎসাহ ছিল পালকি বাহকদের ওপর, উচু-নিচু পথে আধা দৌড়ের তালে তালে ওদের গান শুনায়। শীত মৌসুমে এমন দৃশ্য
। মাঝে মধ্যেই দেখা যেত। আমার প্রাইমারি স্কুলের নাম ছিল মণ্ডল বাড়ি ইসকুল। আমাদের বাড়ি থেকে দূরে ছিল না, বিশ মিনিট হাঁটা পথ। স্কুলের পশ্চিম সীমান্তে গণকপাড়া গ্রামঃ পূবে কোর্টগী গ্রামের মন্ডল বাড়ি। ইসকুল চৌহদ্দির ভেতরেই ছিল কে. কে. স্কুল। সে ইস্কুলের উত্তরে সরু মেঠোপথ, পশ্চিমের গ্রামীণ জনপদের সংঙ্গে শহরের যোগাযোগ সড়ক। স্কুল সংলগ্ন সেই পথের ধারে বিরাণ কৃষিজমিতে ছিল একটি ছোট কুঁড়েঘর। সেই ঘরের সামনে একপাশে ছিল একটি পালকি। অন্যপাশে রান্না করার মাটির চুলা। সকাল বেলা ওই পথে দাদা সাহেবের হাত ধরে বাজারে যেতাম। যেতে যেতে দেখতাম কুঁড়েঘরের সামনে খোলা আকাশের নিচে জনাকয়েক জোয়ান-মরদ কেউ পাটা-পুতা ঘষে মশলা পিষছে, কেউ ভাত রাঁধছে, কেউ হুক্কা টানছে, কেউবা ঘরের বিছানাপত্র রোদে শুকাতে দিচ্ছে। ওই দৃশ্য গোটা শৈশব-কৈশোর জুড়ে আমি মুন্সীগঞ্জ-টঙ্গীবাড়ির পথে-প্রান্তরে দেখেছি। আমার অবুঝ মনের সাধ হতো ওই দলে ঢুকে ভাঁত রাঁধি, মশলা বাটি, তামাক খাই, পালকি টানি। সাধ মিটাতে একদিন স্কুল ছুটির পর ওদের ঘরের সামনে গেলাম। চুলায় লাল চালের ভাত টগবগিয়ে ফুটছে। ফুটন্ত আধা-সিদ্ধ ভাতের গন্ধে ছোট আঙিনাটা মৌ মৌ করছে। সেই ঘ্রাণ নাকের ভিতর দিয়া রসনায় গিয়ে জিবে পানি এনে দিল। আমার চারপাশের চেনা মানুষদের চেয়ে ওইসব মানুষ ছিল একেবারে আলাদা, যেন ভিন্ন গ্রহের মানুষ। এদের দেহের গঠন ছিল গাছের গুঁড়ির মতো শক্ত পোক্ত। বেটে পেশীবহুল শরীর। লোকেরা এদের মাউরা নামে চেনে। বিয়ে-শাড়িতে এদের ডাক পড়তো ছেলের বাড়িতে দুলা ও দুলহানকে পালকি কাঁধে বহন করা। মাউরাদের অনুচ্চ কুঁড়েঘর, দেখেছি মুন্সীগঞ্জ-টঙ্গীবাড়ির পথেঘাটে, হাট-বাজারে। চাঠাতি পাড়া মামা বাড়ি যেতে সিদ্ধেশ্বরী হাটের (টঙ্গীবাড়ি) একটি অশ্বথ বৃক্ষের নিচে এদের একটি কুঁড়েঘর ছিল। ক্লান্তি নিবারণের ছলে ওদের কুটির প্রাঙ্গণে বসেছি। ওরা তখন খইয়ামটর চালের ভাত মাটির হাড়িতে রান্না করছিল। একটু পরে ভাত চুলা থেকে নামিয়ে ফেন (ভাতের মাড়) করালো একটা মাটির পাত্রে। তারপর চুলায় চড়ালো মটরের ডাল। ভাতের হাঁড়ি থেকে ঘেঁটে বের করলো সিদ্ধ আলু। এবার পোড়া মরিচ, পেঁয়াজ কুচি, ধনেপাতা, লবণ, সরিষার তেল একত্রে কচলিয়ে তা দিয়ে আলু চটকে ভর্তা বানালো। লাল টকটকে আলু ভর্তা। আধ-সেদ্ধ ডাল ঘুটে ঘুটে শেষে তিলের তেল, শুকনা মরিচ, জিরা, পেঁয়াজ ভেজে বাগার দিল। বাগারের গন্ধে আমার রসনা উতলা হলো। অতঃপর সবাই সানকি ভর্তি ধুমায়িত ভাত নিয়ে খোলা আকাশের নিচে খেতে বসল। ওদের আলু ভর্তা আর ডাল দিয়ে ভাত খাওয়া দেখে মনে হলো যেন অমৃত আস্বাদন করছে। ভাত এতো অমৃত হয় তা চাক্ষুষ না দেখলে কখনো বিশ্বাস হতো না। ওই অমৃত ভোজ এখনো আমাকে হরণ করে। আড়িয়ল বাজারে (টঙ্গীবাড়ি) একই নমুনার কুটির দেখেছি। দেখেছি মাউরাদের জীবনযাত্রা। বজ্রযোগিনী বাজার, বাঘিয়া বাজার এবং মাকহাটি হাটেও ছিল তদ্রুপ কুটির। মাউরাগণ মারোয়ারী নাকি বিহারী ছিলেন তা আমি আজও জানি না। কোনো কোনো পালকি বাহকগণ ফরিদপুরী ছিল বলে শুনেছি। তারা কোকু ধর্মের অনুসারী ছিলেন তাও জনতাম যেতে
না। পালকি ও পালকির বাহক মাউরাদের নানা স্মৃতি নিভৃতে জেগে আছে আছে স্মৃতির পাতায়, মনিকোঠায়। যেমন দিনের আকাশে জেগে থাকে রাতের সকল তারা। মনিকোঠা শব্দটা একটা নরম সেকেলে শব্দ, এখন আর কেউ লেখালেখি কিংবা কথোপকথনে ব্যবহার করে না। হয়তো মনিকোঠা জিনিসটা মন থেকে উধাও হয়ে গেছে। আমি আমার মনের অবস্থা বুঝাতে মনিকোঠার বিকল্প কোনো জুতসই শব্দ পাইনি। কিশোর বয়সে পালকির পেছনে দৌড়িয়ে খাল বিল ফসলের মাঠ পার হয়ে কতবার যে কনের বাড়ির বিবাহ বাসরে গেছি, তা লেখাজোখা নেই। বরের বাড়ি থেকে কনের বাড়ির দূরত্ব কোনো কোনো ক্ষেত্রে পনেরো মাইল ছাড়িয়ে যেত। চার চার পালকি বাহক ছড়ার ছন্দে তালে তালে পথ পাড়ি দিতেন। প্রচণ্ড শীতেও ঘেমে ভিজে যেতেন। লম্বা পথ হলে মাঝে মাঝে জিরিয়ে নিতেন। সাঁঝবেলা কিংবা একটু রাত হলে বরের বাড়ি থেকে দুলহাকে
পালকিতে নিয়ে কন্যার বাড়ির উদ্যেশ্যে রওনা, পেছন পেছন হাঁটে চলনদার দল। রাতের অন্ধকারে পথ চলতে হ্যাজাক লাইট বহন করা হতো। হ্যাজাক লাইটের আলো খুব পছন্দ ছিল আমার। আমরা ছোটরা শীত, কাদা-পানি, ঝোঁপ-জঙ্গল, সাপ-খোপের ভয়, বাধা উপেক্ষা করে পালকির পেছনে দৌঁড়াতাম। সবচেয়ে দীর্ঘপথ দৌড়িয়ে ছিলাম এক ভাইয়ের বিয়েতে চারাতি পাড়া (টঙ্গীবাড়ি) থেকে কেওয়ার মুন্সীগনজ) ১০ মাইলের পথ। আহা সেকি আনন্দ ছিল সেই দৌঁড়ানোয়। রাত কাটে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা, খানাপিনা ও আড্ডায়। ভোরবেলা দুলহান নিয়ে ফিরতি যাত্রা। আমার শৈশব-কৈশোর ছিল পালকিময়। স্বপ্ন দেখতাম বড় হয়ে বর সেজে পালকি চড়ে বিয়ে করতে যাব। রাজকন্যা নিয়ে ভোরবেলা বাড়ি ফিরেবো। বাড়িয় উঠোনে বর-বধূবরণের ঘনঘটা হবে…। আমার সেই স্বপ্ন পূরণের সময় যখন এলো, তখন পালকি নিরুদ্দেশ! পালকি পর্তুগিজ শব্দ, ইংরেজিতে পালকিটি। সংস্কৃত বা পালি ভাষায় পালকি শব্দ নাই, আছে পালঙ্ক। ষোড়শ শতাব্দীতে পর্তুগিজ হার্মাদ-ফিরিঙ্গীদের মাধ্যমে শব্দটি এদেশে এসে বাংলায় হয়ে গেছে পালকি বা চতুর্দোলা। পালকির ব্যবহার ঠিক কত আগে শুরু হয় তা জানা যায় না। আদিম যুগের মানুষ শিকার করা মৃত পশু লাঠিতে ঝুলিয়ে চ্যাংদোলা করে বয়ে নিয়ে আসত নিজেদের আস্তানায়। শিকার বহনের এই রীতি থেকেই পালকির ধারণা এসে থাকবে। মিশরীয় ও মায়া সভ্যতার চিত্রলিপিতে পালকির ছবি পাওয়া গেছে। রামায়ণে পালকির কথা এসেছে। পুরাণ কাহিনিতে পালকি বরাদ্দ ছিল শুধু শুধু ঠাকুর-দেবতার জন্য। নিকট অতীতে পালকির ব্যবহার দেখা যায় সুলতান, সম্রাট ও নবাবী জামানায়। মোগল আমলে রাজপরিবারের নারীদের মাঝে পালকি জনপ্রিয় ছিল। যুদ্ধের সময় মোগল রমণীরা সম্রাটের সঙ্গে ময়দানে যেতেন পালকি চড়ে। সম্রাট হুমায়ুন শের শাহের কাছে পরাজিত হয়ে বহুদিন ফেরারি ছিলেন। ফেরারি জীবনে হুমায়ুনের স্ত্রী স্বামীর সঙ্গে চলতেন পালকিতে চড়ে। পালকিতে ঘুরতে ঘুরতে গুজরাটের মরুপ্রান্তরে জন্ম নেয় শিশু সম্রাট আকবর। বৃটিশ জমানায় পালকি ছিল অমাত্য, সামন্ত, জমিদার, বৃটিশ সাহেব-সুবা এবং নব্য ধনিক বাবু এবং শেরিফদের বাহন।
পলাশীর যুদ্ধ শেষে কম্পানির সবার্থে কলকাতায় তৈরি হয় দালাল বেনিয়া, মুৎসুদ্দি শ্রেণি। ব্যয়বহুল জীবন ও বিলাসিতায় ধলা সাহেব আর কালা নেটিভ কোনো তফাৎ রইল না। বাবুদের বাড়িতেও সরকার, খিৎমদগার, খানসামা, পালকি বেহারা। নেটিভ রাজা মহারাজার বাড়িতে একাধিক পালকি। কোনোটা কত্তার জন্য, কোনোটা গিন্নির জন্য, আবার কোনোটাতে ঠাকুর নিয়ে গঙ্গাতে যান পুরোহিত মশায়। বৃটিশ জমানার শেষাবধি পর্যন্ত পায়ে হেঁটেই চলত গরীবের দূরের যাত্রা। বিংশ শতাব্দী নাগাদ পালকি গ্রামীণ মধ্যবিত্তের নাগালে আসে এবং ক্রমশ এর জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে গাঁও-গ্রামের কৃষকের আঙিনা পর্যন্ত। সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত পালকির গান ছড়ায় তুলে ধরেছেন এ দেশের গাঁয়ের পথে চলা পালকির অবিস্মরণীয় চিত্র। পালকি বাহকেরা বিশেষ ধরনের গান গাইতেন যার কথা ও ভাষা ছিল জীবন থেকে
নেওয়া। যেমন-
কর্তাবাবুর রংটি কালো,
গিন্নি মায়ের মনটি ভালো,
সামলে চলো হেইও।
পালকির বাহকদের বেহারা কোথাও আবার বলে কাহার, নানা জায়গায় নানা নাম। পালকি নিয়ে গান গেয়েছেন ভূপেন হাজারিকা। তাঁর ‘দোলা হে দোলাথ গানটিতে তিনি পালকির বেহারাদের দুঃখভরা জীবন সংগ্রামের করুণ চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন। ঔপন্যাসিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাঁসুলি বাঁকের উপন্যাস হতদরিদ্র কাহার সমাজের করুণ চিত্র তুলে ধরেছেন। রোদ-ঝড়-বৃষ্টি মাথায় করে, ভীষণ কষ্ট সয়ে বেহারার দল পালকি বয়ে নিয়ে যেত মাইলের পর মাইল। আমাদের উপমহাদেশের পালকির চেহারা ছিল চারকোণা সিন্দুকের মতো। দুপাশে দুটো দরজ্ঞকাপড়ের পর্দা দিয়ে দরাজা ঢাকা। কিছু পালকির চেহারা সিংহাসনের মতো। ওপরের দিক খোলা আরামদায়ক এক চেয়ার যেন। গুপি গাইন বাঘা বাইন সিনেমার ওই পালকিটা সিংহাসনের মতো ছিল দেখতে। ব্রিটেনের অভিজাত লোকেরা যেসব পালকিতে চড়তেন, সেগুলোতে আবার ছিল শোবার ব্যবস্থাও।
পালকির সামনে ও পেছনে এক বা একাধিক লম্বা হাতল থাকে। সেই হাতল কাঁধে রেখে বেহারা বয়ে নিয়ে চলেন পালকি। পালকির সামনে ও পেছনে এক বা একাধিক লম্বা হাতল খাকে। সেই হাতল কাঁধে রেখে বেহারা বয়ে নিয়ে চলেন পালকি। পালকির আকারের ওপর নির্ভর করে পালকির ভার বইবেন কয়জন বেহারা। দুই, চার, হয়, আট এমনকি ঘোলো বেহারার পালকির চলনও ছিল।
















