স্টাফ রিপোর্টারঃ
সাংবাদিকতা একসময় ছিল সমাজের দর্পণ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর মাধ্যম। অথচ আজ সেই সাংবাদিকতা অনেকাংশেই কর্পোরেট প্রভাব, রাজনৈতিক পক্ষপাত এবং পেইড নিউজের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে, বিভুরঞ্জনের মতো আপসহীন সাংবাদিকদের জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে কী হারিয়েছি আমরা, আর কোন পথে যাচ্ছি।-
বিভুরঞ্জন ছিলেন একজন নির্ভীক সাংবাদিক, যিনি সত্যের প্রশ্নে কোনো আপোষ করেননি। তার সাংবাদিকতা ছিল জনগণের পক্ষে, ক্ষমতার বিরুদ্ধে। তিনি ছোট একটি আঞ্চলিক সংবাদপত্রে কাজ করলেও, তার লেখার তীক্ষ্ণতা ও নৈতিকতার জোর ছিল জাতীয় পর্যায়েও আলোড়ন তোলার মতো।-
তিনি কেবল রিপোর্ট করতেন না — তিনি অনুসন্ধান করতেন, প্রশ্ন তুলতেন, এবং সত্যের মুখোমুখি হতে ভয় পেতেন না। তার কলম ছিল সাধারণ মানুষের মুখপত্র। তিনি দুর্নীতিবাজ প্রশাসনের বিরুদ্ধে, ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে, এমনকি সংবাদপত্রের মালিকপক্ষের অনৈতিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ করেছিলেন।-
আজকের গণমাধ্যমে সত্যের স্থান সঙ্কুচিত হয়েছে। সংবাদকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, আর সাংবাদিককে বলা হয় ব্র্যান্ড বানাতে। এই ভিন্ন বাস্তবতায় বিভুরঞ্জনের মতো একজন আদর্শবাদী সাংবাদিক হয়ে ওঠেন একরকম ‘বেখাপ্পা’।-
তাকে বলা হয়েছিল, “কম আদর্শবাদী হতে”, “সম্পাদকের পছন্দ বুঝে চলতে”, “প্রতিবেদন লেখার আগে বিজ্ঞাপনদাতাদের চিন্তা করতে”। কিন্তু তিনি তা মানেননি। ধীরে ধীরে তাঁকে হেয় করা হয়, গুরুত্বহীন প্রতিবেদনে পাঠানো হয়, এবং এক সময় তিনি চাকরি হারান।-
তাঁর শেষ দিনগুলো কেটেছে একাকীত্বে, অভাবে, অথচ মাথা উঁচু রেখে। তিনি হয়তো অর্থ-সম্পদ পাননি, কিন্তু রেখে গেছেন সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতার এক অনন্য উদাহরণ।-
বিভুরঞ্জনের মৃত্যু ছিল শারীরিকভাবে স্বাভাবিক, কিন্তু সামাজিকভাবে এটি ছিল এক ‘অপমৃত্যু’। এটি ছিল একজন সৎ সাংবাদিকের আত্মার পরাজয়, কারণ সমাজ তার জায়গা করে দিতে পারেনি। কিন্তু এটি শুধু ব্যক্তির মৃত্যু নয়, সাংবাদিকতার একটি ধারার মৃত্যু — প্রশ্ন করার, প্রতিবাদ করার, আদর্শে দাঁড়িয়ে থাকার।-
বিভুরঞ্জনের মতো সাংবাদিকরা আজ আর প্রায় নেই — কিংবা তারা আছে, তবে নিঃসঙ্গ। তাদের জায়গা নিচ্ছে ‘স্টার রিপোর্টার’, যারা ভাইরাল হবার খেয়ালে তথ্যকে বিকৃত করতে দ্বিধা করেন না।-
তবু বিভুরঞ্জনদের স্মরণ করা, তাদের জীবনের আদর্শকে চর্চা করা এখন আরও জরুরি। কারণ তারা আমাদের দেখিয়েছেন — সাংবাদিকতা কেবল পেশা নয়, এটি এক ধরনের দায়িত্ব, এবং কখনো কখনো, এক ধরনের ত্যাগ।–
“তারা আমার কলম কেড়ে নিতে চায়, কিন্তু আমি জানি, এই কলম রক্তে লেখা। তাই এর কালি শেষ হবার আগে আমি থামবো না…” — বিভুরঞ্জন, তার মৃত্যুর ক’দিন আগে, শেষ চিঠিতে লিখেছিলেন এমনই এক লাইন।-
বিভুরঞ্জনের জন্ম এক মফস্বল শহরে, এক সাধারণ পরিবারে। ছোটবেলা থেকেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার এক অদ্ভুত সাহস ছিল তার। কলেজজীবনে ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত থাকলেও তিনি উপলব্ধি করেন, বাস্তব পরিবর্তন আনতে হলে প্রয়োজন এক নিরপেক্ষ ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো কণ্ঠ — সাংবাদিকতা তাই হয় তার পেশা নয়, এক প্রকার ব্রত।-
ঢাকার একটি নামকরা দৈনিকের রিপোর্টার হিসেবে তিনি তার কর্মজীবন শুরু করেন। তার প্রথম আলোচিত প্রতিবেদন ছিল এক জনপ্রতিনিধির জমি দখলের কাহিনী, যেখানে স্থানীয় প্রশাসনের যোগসাজশ স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছিল। তার রিপোর্ট ছাপা হবার পর তিনদিনের মাথায় সেই জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয় — এবং ঠিক তখন থেকেই বিভুরঞ্জনের বিরুদ্ধে চাপও শুরু হয়।-
বিভুরঞ্জন সবসময় বলতেন — “যে সাংবাদিক প্রশ্ন করতে ভয় পায়, সে সাংবাদিক নয়, সে প্রচারক।”-
কিন্তু আজকের কর্পোরেট নিয়ন্ত্রিত মিডিয়ায় সত্য প্রশ্ন করাটা ‘অপরাধ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভুরঞ্জন সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলেন।
একবার তিনি একটি বড় ব্যবসায়ী গ্রুপের বিরুদ্ধে পরিবেশ বিধ্বংসী প্রকল্প নিয়ে রিপোর্ট করতে গিয়ে সরাসরি হুমকি পান। সম্পাদকের কক্ষ থেকে বেরিয়ে এসে তাকে বলতে শোনা যায়, “আমাকে আজ বলা হলো, এই রিপোর্টটা ‘ঠান্ডা’ রাখতে। কিন্তু আমি জানি, এই প্রকল্পে তিনটি গ্রামের কৃষিজমি শেষ হয়ে যাবে।”-
তার প্রতিবেদনটি আর ছাপা হয়নি। সে রাতেই তিনি তার ব্যক্তিগত ডায়েরিতে লেখেন, “আমি বুঝি, এখন সত্যও বিজ্ঞাপনদাতাদের অনুমতি নিয়ে বেরোবে”।
বিভুরঞ্জনের মৃত্যু শুধু একজন মানুষের না — এটা এক প্রকার আদর্শের মৃত্যু, এক সাহসী কণ্ঠের অপমৃত্যু। আজ তাকে স্মরণ করতে গিয়ে প্রশ্ন জাগে — বিভুরঞ্জনের মতো সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিক কি আজকের দিনে টিকে থাকতে পারে?
আমরা যারা পাঠক, যারা সংবাদমাধ্যমের ভোক্তা, তারাও কি দায়ী না? আমরা ভাইরাল সংবাদের পেছনে ছুটি, সস্তা উত্তেজনায় মেতে উঠি, অথচ যে সাংবাদিক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সত্য খোঁজেন — তার লেখা কেউ পড়ে না।-
বিভুরঞ্জনের মতো মানুষ মরলেও, তাদের আদর্শ মরে না। তার শেষ চিঠি, তার প্রতিবাদী লেখাগুলো আজ আমাদের কাছে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় — সাংবাদিকতা কি সত্যের জায়গায় থাকবে, না কি তা হয়ে যাবে কেবল সুবিধাবাদীদের হাতিয়ার?- আমরা যদি সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকদের পাশে না দাঁড়াই, তবে আমাদের ভবিষ্যৎ শুধু বিভুরঞ্জনের মৃত্যু নয়, সাংবাদিকতারও শবযাত্রা হবে।-

















